দেশের প্রথম সর্বাধুনিক রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার উদ্বোধন
31 Aug, 2025 10:00 AM - 31 Aug, 2025 01:00 PM |
বিএমইউ এর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে
দীর্ঘমেয়াদি স্নায়ুজনিত রোগ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের চিকিৎসায়
দেশের প্রথম সর্বাধুনিক রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার উদ্বোধন
বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত
দীর্ঘমেয়াদি স্নায়ুজনিত রোগ ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের সর্বাধুনিক চিকিৎসাসেবা প্রদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) এর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে আজ রবিবার ৩১ আগস্ট ২০২৫ইং তারিখে দেশের প্রথম সর্বাধুনিক রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার উদ্বোধন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের অডিটোরিয়ামে (লেকচার হল-কক্ষ নং-৫০৭) এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা জনাব নূরজাহান বেগম। বিশেষ অতিথি ছিলেন মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) অধ্যাপক ডা. মোঃ সায়েদুর রহমান, বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের মান্যবর রাষ্ট্রদূত মিঃ ইয়াও ওয়েন (Mr. Yao Wen), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সেবা বিভাগের মাননীয় সচিব জনাব মোঃ সাইদুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যায়ের মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মোঃ শাহিনুল আলম। অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শনীসহ রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের কার্যক্রম বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন ফিজিক্যাল মেডিসিন এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মোঃ আব্দুস শাকুর। বিএমইউর রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মোঃ নজরুল ইসলাম ও সহকারী প্রক্টর ডা. রিফাত রহমান এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্মানিত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মোঃ আবু জাফর, বিএমইউ এর সম্মানিত প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) ও রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোঃ আবুল কালাম আজাদ, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মোঃ মুজিবুর রহমান হাওলাদার, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মসূচীতে অংশগ্রহণকারী চিকিৎসক, ফিজিওথেরাপিস্টদের মাঝে সার্টিফিকেট প্রদান করেন প্রধান অতিথি মাননীয় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা জনাব নূরজাহান বেগম। অনুষ্ঠানের শুরুতে মাননীয় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের বেইজমেন্টে স্থাপিত দেশের প্রথম সর্বাধুনিক রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার পরিদর্শন ও উদ্বোধন করেন। মাননীয় স্বাস্থ্য উপদেষ্টার এই রোবোটিক সেন্টার উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষদের চিকিৎসাসেবার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে।
রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার উদ্বোধনের পরে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের লেকচার হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাননীয় উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম বলেন, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থাপিত রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারকে অবশ্যই টেকসই হতে হবে এবং এই সেন্টারকে যতটা সম্ভব বিকেন্দ্রীকরণ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে আরো তিন-চারটি জেলায় যাতে এটা ছড়িয়ে দেয়া যায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় একটি বড় হাসপাতাল। এখানে অনেক বড় কিছু হওয়ার সম্ভাবনা আমরা দেখি। এখানকার সেবা সারাদেশে ছড়িয়ে যাবে। মানুষ স্বপ্ন দেখলেই তবে স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়। মাননীয় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা তার বক্তব্যে রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠায় সহায়তার জন্য চায়না সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞা প্রকাশ করে বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা যখন হাসপাতাল ভিজিট করলাম তখন দেখলাম অনেকের হাত নেই, পা নেই। অনেকের হাত-পা অকেজো হয়ে আছে। তখন তাদের উন্নত চিকিৎসার কথা ভাবলাম। আমি চীনকে বলেছিলাম আমাদের যদি ১০-১৫ টা রোবট দিতে পারে; আমরা চিকিৎসা কার্যক্রমটা চালাতে পারতাম। কিন্তু চীন ৫৭টি রোবট দিয়েছে। এছাড়া চীনের প্রতিনিধিরা আমাদের ২৯ জনকে ট্রেনিং দিয়েছে। আমি বলেছি রোবটের মেইনটেনেন্স সক্ষমতার জন্য আমাদের লোকজনকে ট্রেনিং করাতে হবে। এই সেন্টারকে সাস্টেইনেবল করতেই হবে। তিনি তার বক্তব্যে রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারটি স্থাপনে চীনের যারা যুক্ত ছিলেন সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চীনের মান্যবর রাষ্ট্রদূত মিঃ ইয়াও ওয়েন (Mr. Yao Wen), বাংলাদেশের মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীন সফর করায় প্রধান উপদেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, চীন বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়নে সহয়তা দিয়ে আসছে। স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নে চীন সরকার সবধরণের সহায়তা করে যাবে। বাংলাদেশের বন্ধু দেশ হিসেবে চিকিৎসাখাতে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠায় চীন আন্তর্জাতিকমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে। ভবিষ্যতে চীন আরো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে বাংলাদেশের পাশে থাকবে। সম্প্রতি বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি আহতদেও বিশেষ করে মাইলস্টোন স্কুল এ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনায় আহতদের চিকিৎসায় চীন অতি দ্রুত সহায়তা প্রদান করেছে। চীনে বাংলাদেশীরা যেনো স্বল্প খরচে উন্নত চিকিৎসাসেবা পায় সেই ব্যবস্থা নিয়েছে। সাথে সাথে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবাখাতের উন্নয়নেও সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) অধ্যাপক ডা. মোঃ সায়েদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসাখাতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি স্থানান্তরে বা আনয়নে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাব হয়ে উঠবে। এখান থেকেই বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমূহ দেশের সর্বত্র চিকিৎসাখাতে ছড়িয়ে যাবে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যায়ের মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মোঃ শাহিনুল আলম বলেন, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আজ এটা ঐতিহাসিক দিন। রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার উদ্বোধনের মাধ্যমে দেশে এআই ভিত্তিক চিকিৎসাসেবা শুরু হলো। এই সেন্টারকে ট্রেনিং অব দ্যা ট্রেনার্স হিসেবে গড়ে তোলা হবে। যাদের মাধ্যমে এই সেবা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। বিএমইউকে স্মার্ট ও এআই ভিত্তিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হবে। মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর তার বক্তব্যে ইভিডেন্স বেইসড মেডিসিন, মেডিক্যিাল অডিট, ইনফেকশন কন্ট্রোল সিস্টেম, ইমাজেন্সি মেডিসিন, জেরিয়াট্রিক মেডিসিন, অটোমেশন, ই-লগ বুক, বৈকালিক শিফটে রেডিওথেরাপি চালু, কিডনী ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন, যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরেন।
ফিজিক্যাল মেডিসিন এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের চেয়ারম্যান ও রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোঃ আব্দুস শাকুর বলেন, রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার দক্ষিণ এশিয়াতেই খুব একটা নেই বললেই চলে। এই সেন্টারে রয়েছে ৫৭টি রোবট। এরমধ্যে এআই বেসইসড রোবটের সংখ্যা ২২টি। এর মাধ্যমে নিখুঁতভাবে ফিজিওথেরাপিসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসেবা দেয়া সম্ভব হবে। এই কেন্দ্র পরিচালনার জন্য চীনের ৭ সদস্যবিশিষ্ট বায়োমেডিক্যাল বিশেষজ্ঞ দল ইতোমধ্যে ২৯ জন দেশীয় চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। জুলাই ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে যারা আহত হয়েছেন বিশেষ করে যাদের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা প্রয়োজন তারা এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদেরকে বিনামূল্যে এই রোবটিক চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। পরবর্তীতে এই চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম সাধারণ রোগীদের জন্যও উন্মুক্ত করা হবে। সেবার খরচ রোগীদের সামর্থ্যের মধ্যে রাখা হবে।
তিনি আরো জানান, উন্নত বিশ্বে ব্যবহৃত প্রযুক্তি অনুসরণ করে চীনের প্রযুক্তিগত সহায়তায় এই সেন্টারটি প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এই সেন্টারে চীন সরকার প্রায় ৩০ কোটি টাকা মূল্যের অত্যাধুনিক রোবটিক যন্ত্রপাতি দিয়েছে, যা এই কেন্দ্রকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক রোবোটিক রিহ্যাব সেন্টারে পরিণত করেছে। এই রোবটিক রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার চালু হওয়ায় দেশের চিকিৎসা খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। এটি প্রযুক্তির অগ্রগতি তো বটেই, একই সঙ্গে পক্ষাঘাত ও স্নায়ুবিক সমস্যায় ভোগা অসংখ্য মানুষের জীবনে আশার আলো হয়ে উঠবে। সেন্টারটি চালু হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য যে সকল (সংশ্লিষ্ট রোগীরা) রোগীরা বিদেশ যায় ভবিষ্যতে তারা এখানে চিকিৎসা নিতে পারবেন, এতে করে দেশের প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।
গুরুত্বপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেসিক সাইন্স ও প্যারাক্লিক্যাল সাইন্স অনুষদের সম্মানিত ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী, মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মোঃ শামীম আহমেদ, সার্জারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মোঃ ইব্রাহীম সিদ্দিক, ডেন্টাল অনুষদের ডিন সহযোগী অধ্যাপক ডা. সাখাওয়াত হোসেন, পরিচালক (হাসপাতাল) ব্র্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু নোমান মোহাম্মদ মোছলেহ উদ্দীন, পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) ডা. এরফানুল হক সিদ্দকী, চীফ এস্টেট অফিসার ডা. মোঃ এহতেশামুল হক তুহিন, পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) খন্দকার শফিকুল হাসান রতন, সুপার স্পেশালাইজ হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক ডা. মোঃ শাহিদুল হাসান বাবুল, উপ-পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. মোহাম্মদ আবু নাছের, উপ-পরিচালক (সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল) ডা. এ কে আল মিরাজ, সহকারী প্রক্টর ডা. শাহরিয়ার শামস লস্কর, সহকারী প্রক্টর ডা. রিফাত রহমান প্রমুখসহ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনবৃন্দ, বিভাগীয় চেয়ারম্যানবৃন্দ, অফিস প্রধানগণ, ফিজিক্যাল মেডিসিন এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন বিভাগের শিক্ষক, চিকিৎসকবৃন্দ, রেসিডেন্টবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
সম্পাদনায়: ডা. সাইফুল আজম রঞ্জু। ছবি: মোঃ আরিফ খান। নিউজ: প্রশান্ত মজুমদার।